প্রধানমন্ত্রী পদে নেতানিয়াহুকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন কে এই মরক্কো বংশোদ্ভূত জেনারেল?
ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকট বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। একসময় তিনি নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন, কিন্তু এখন তিনি তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করছেন।
গাদি আইজেনকট ১৯৬০ সালে ইসরায়েলের টিবেরিয়াস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা-মা ছিলেন মরক্কো থেকে আসা ইহুদি অভিবাসী। ১৯৭৮ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রায় ৪০ বছরের সামরিক জীবনে ধাপে ধাপে উন্নীত হয়ে ২০১৫ সালে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর প্রধান (Chief of Staff) হন। ২০১৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন।তিনি দ্বিতীয় ইন্তিফাদা, পশ্চিম তীর এবং উত্তরাঞ্চলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। আইজেনকট দাহিয়ে ডকট্রিন-এর অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত।
এই নীতির মূল ধারণা হলো: যেখান থেকে ইসরায়েলের ওপর হামলা চালানো হবে, সেই এলাকার বেসামরিক অবকাঠামোর ওপরও ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হবে। উদ্দেশ্য হবে এত বেশি ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করা যাতে ভবিষ্যতে শত্রুপক্ষ হামলা চালাতে নিরুৎসাহিত হয়।এই নীতির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে, কারণ এটি বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। নেতানিয়াহুর সঙ্গে সম্পর্ক: ২০১৫ সালে নেতানিয়াহুই তাঁকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। তখন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, ‘ইসরায়েলের জনগণ আপনার ওপর বিশ্বাস রাখে, সরকার আপনার ওপর বিশ্বাস রাখে, আমিও আপনার ওপর বিশ্বাস রাখি।’ কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই দুজনের সম্পর্ক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রূপ নেয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর আইজেনকট জরুরি জাতীয় সরকারের যুদ্ধ মন্ত্রিসভায় যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের চাপে হামাসের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নষ্ট করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যারা নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিল, তাদের সবাইকে মূল্য দিতে হবে এবং পদ ছাড়তে হবে।’ ২০২৫ সালে তিনি বেনি গান্টজের দল ছেড়ে ইয়াশার নামে নতুন দল গঠন করেন। দলের লক্ষ্য:জাতীয় ঐক্য ফিরিয়ে আনা রাজনৈতিক বিভাজন কমানো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা অতি-রক্ষণশীল (আলট্রা অথোডক্স) ইহুদিদেরও বাধ্যতামূলক সামরিক বা জাতীয় সেবায় অন্তর্ভুক্ত করা বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর জনপ্রিয়তার কয়েকটি কারণ হলো: দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা শান্ত ও পেশাদার নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ব্যক্তিগত ত্যাগ গাজা যুদ্ধে তার ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হন।
অনেক ইসরায়েলি মনে করেন, তিনি নিজেও যুদ্ধের ব্যক্তিগত মূল্য দিয়েছেন। ফিলিস্তিন সম্পর্কে তার অবস্থান: আইজেনকট নিজেকে বাস্তববাদী হিসেবে তুলে ধরেন। হামাসকে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে অপসারণ করতে হবে। গাজায় সংস্কারকৃত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ শাসনভার নিক। পশ্চিম তীর সম্পূর্ণভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার বিরোধী। তবে তিনি কখনো প্রকাশ্যে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থন করেননি। তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সাধারণ ফিলিস্তিনি জনগণকে এক করে দেখা উচিত নয়। তিনি কি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন? সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তার দল ইয়াশার শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তবে ইসরায়েলের সংসদে সরকার গঠনের জন্য ১২০ আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের মতে: যদি বিরোধী দলগুলো একজোট থাকতে পারে, তবে আইজেনকটের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নেতানিয়াহু অত্যন্ত রাজনৈতিক কৌশলী এবং শেষ মুহূর্তে জোট গঠন করে আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারেন। গাদি আইজেনকট একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাপ্রধান, যিনি দীর্ঘ সামরিক অভিজ্ঞতা, তুলনামূলক সংযত রাজনৈতিক ভাষা এবং নেতানিয়াহুবিরোধী জনমতকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান বিরোধী নেতা হিসেবে উঠে এসেছেন। যদিও তিনি নিরাপত্তার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত এবং তাঁর সামরিক অতীত বিতর্কিত, অনেক ইসরায়েলি তাঁকে বর্তমান সরকারের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী ও ঐক্যবদ্ধ নেতৃত্বের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
সূত্র: মিডলইস্ট আই

মন্তব্য করুন