নারী-শিশু নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল: বিএনপি নেতাকে শোকজ, আইনি ব্যবস্থা নেই
মোঃ নাঈমূর রহমান রনি ,কলাপাড়া উপজেলা প্রতিনিধিঃ পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পাঁচ হাজার টাকা চুরির অপবাদে ষষ্ঠ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী এবং তার বিধবা মাকে রাতভর মারধর, নির্যাতন ও শিকলে বেঁধে রাখার অভিযোগ উঠেছে কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুনু তালুকদার ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে।
নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ঘটনার প্রেক্ষিতে পটুয়াখালী জেলা বিএনপি সংশ্লিষ্ট নেতাকে কারণ দর্শানো (শো-কজ) নোটিশ প্রদান করেছে। ঘটনার বিবরণ: ভুক্তভোগী শিশু জিসান হোসেন (১২) উপজেলার চাকামইয়া ইউনিয়নের তারিকাটা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে গামছাডুনিয়া গ্রামের বাড়ি থেকে জিসানকে তুলে নিয়ে যান আদমুল হাই তালুকদারসহ কয়েকজন। পরে পাঁচ হাজার টাকা চুরির অভিযোগে বাঁশের লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে গোয়ালঘরের শিকলে বেঁধে রাখা হয়।
খবর পেয়ে তার মা নাজমা বেগম ছেলেকে বাঁচাতে গেলে তাকেও মারধর করা হয়। এরপর মা ও ছেলেকে তিন দিন বাড়িতে আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। মঙ্গলবার ভোররাতে এক ব্যক্তির সহযোগিতায় পালিয়ে তারা কলাপাড়া হাসপাতালে ভর্তি হন। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাজমা বেগম জানান, তার ছেলে টাকা চুরি করেনি। প্রায় দেড় বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর জমি কেনার জন্য তিনি আদমুল হাই তালুকদারকে এক লাখ টাকা দিয়েছিলেন। সেই টাকা ফেরত না দেওয়ার জেরে এই নির্যাতন চালানো হয়েছে। জিসানের ছোট বোন মুনা জানায়, নির্যাতনের পর তাদের ওষুধও খেতে দেওয়া হয়নি। চিকিৎসক ও পুলিশের বক্তব্য: কলাপাড়া হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, মা ও ছেলে দুজনের শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করা হয়েছে।
কলাপাড়া থানার ওসি নজরুল ইসলাম জানান, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযুক্তদের বক্তব্য: অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুনু তালুকদার ও তার ভাই আদমুল হাই তালুকদার দাবি করেছেন, ছেলেটি টাকা চুরি করে তাদের বাড়ি থেকে নিয়ে গেছে। সাংগঠনিক পদক্ষেপ ও শোকজ নোটিশ: ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পটুয়াখালী জেলা বিএনপি বিষয়টি মারাত্মকভাবে বিবেচনা করে। পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি স্নেহাংশু সরকার কুট্টি এবং সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মজিবুর রহমান টোটন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে (স্মারক নং- ZillaBNP/PTK/26-62, তারিখ: ২৩-০৯-২০২৬ ইং) অ্যাডভোকেট হাফিজুর রহমান চুনু তালুকদারকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, একজন ১২ বছর বয়সী শিশু ও তার মায়ের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ এবং এ সংক্রান্ত ভিডিও ভাইরাল হওয়াটি নৈতিক অবক্ষয় ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পরিপন্থী। কেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না—তা আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত জবাব দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের একাংশের দাবি, মারাত্মক এই শারীরিক নির্যাতনের ঘটনার পর কেবল দলীয় শো-কজ নোটিশ দিয়েই দায় সারছে দলীয় নেতৃত্ব, যা আইনি ব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। ভুক্তভোগীদের সুষ্ঠু বিচার ও আইনগত নিরাপত্তার দাবি জানানো হয়েছে।

মন্তব্য করুন