মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে শঙ্কায় শ্রমবাজার

ডেস্ক রিপোর্ট:
প্রকাশ :
ছবি:সংগৃহিত


মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোয় সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছিল করোনা মহামারির সময়। এরপর ধীরে ধীরে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করলেও সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যজুড়েও ছড়িয়ে পড়ে।এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোয় আবারও বড় ধাক্কা লাগায় সংকটে পড়ে এই খাত। অন্যদিকে যুদ্ধের কারণে কাজ হারিয়ে অনেক শ্রমিককে দেশেও ফেরত আসতে হয়। এতে দেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্র নতুন করে হুমকির মুখে পড়ে।


 সূত্র মতে, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোয় নতুন কর্মীর চাহিদা ব্যাপক হারে কমে যায়।জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন এক লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী। অথচ এর আগের বছর একই সময় এই সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ৪১ শতাংশ। শ্রমবাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যটন, সেবা ও বাণিজ্য খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক অবস্থান নেয়। এ কারণে নতুন করে শ্রমিক নেওয়ার অনুমোদনের হার কমতে শুরু করে।


 একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী শত শত ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় নতুন কর্মীদের বিদেশযাত্রাও বিলম্বিত হতে থাকে। আগে যেখানে ন্যূনতম বিমানভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা, ফ্লাইটসংকটের কারণে তা এখন বেড়ে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শ্রমিক যান সৌদি আরবে। ২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া মোট কর্মীর প্রায় সাত লাখ ৫২ হাজার গেছেন শুধু সৌদি আরবে। এর বাইরে কাতারে যান এক লাখ ৬৯ হাজার, কুয়েতে যান ৪২ হাজার ৪৯৬ জন। অন্যদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল ৫ জুন পর্যন্ত বিদেশে গেছেন তিন লাখ ১৪ হাজার ৩৬২ জন বাংলাদেশি কর্মী। এর মধ্যে সৌদি আরব গেছেন এক লাখ ৯০ হাজার ৭২ জন, কাতারে গেছেন ২৩ হাজার ৭৮০ জন, কুয়েতে আট হাজার ৭৫৩ জন, জর্দানে সাত হাজার ৩৫৩ জন, আরব আমিরাতে সাত হাজার ১২১ জন এবং ইরাকে তিন হাজার ৯১ জন। 


এ থেকেই বেরিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার তুলনামূলক চিত্র। এর আগের বছরগুলোয় অর্থাৎ করোনার পর ২০২২ সালে মোট ১১ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৮ জন বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। এর মাঝে সৌদি আরব ছিল সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার, যেখানে গেছেন তিন লাখ ৯১ হাজার ৩০২ জন কর্মী। ওমানে এক লাখ ৬৩ হাজার ২১ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেছেন ৭৭ হাজার ৪৭৬ জন, কুয়েতে ২৯ হাজার ৯ জন এবং কাতারে ২৭ হাজার ৬৬৩ জন।২০২৩ সালে সর্বোচ্চসংখ্যক কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। সরকারি হিসাবে ১৩ লাখ পাঁচ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বিদেশে যান। এর মধ্যে সৌদি আরবে চার লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৪ জন, ওমানে এক লাখ ২৭ হাজার ৮৮৩ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯৮ হাজার ৪২২ জন, কাতারে ৫৬ হাজার ১৪৮ জন, কুয়েতে ৩৬ হাজার ৫৪৮ জন, জর্দানে আট হাজার ৬২৬ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। ২০২৪ সালে মোট ১০ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ জন শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবে গেছেন ছয় লাখ ২৭ হাজার ৮১২ জন, কাতারে ৭৪ হাজার ৪৬৪ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) ৪৭ হাজার ১৫৮ জন, কুয়েতে ৩৩ হাজার ১৫ জন, জর্দানে ১৫ হাজার ৪১০ জন এবং লেবাননে চার হাজার ২৩০ জন।


 সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী শরিফুল হক কালের কণ্ঠকে জানান, দুবাইয়ে একটি রেস্তোরাঁ চালান তিনি। ভালোই আয় হচ্ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব পড়েছে আরব আমিরাতে। সেখানে ইরানের হামলার পর দীর্ঘদিন ধরে তাঁর রেস্তোরাঁটি বন্ধ রাখতে হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সেখানে এখনো পর্যটকশূন্য। এতে এখন রেস্তোরাঁ খুললেও বিক্রি নেই। ফলে তাঁর আয়-রোজগারে বড় টান পড়েছে। বর্তমান আয় দিয়ে রেস্তোরাঁ চালানো কষ্টদায়ক হয়ে পড়েছে। দেশে পরিবারকে টাকাও পাঠাতে পারছেন না তিনি। মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোয় বাংলাদেশি কর্মী যাওয়ার বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সেক্রেটারি মাজহারুল ভূইয়া গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের সৌদি আরব রুটটা এখন অনেকটা বন্ধের মুখে।


 কারণ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে ওখানে কাজ করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কুয়েতে যেসব ভিসা হচ্ছে, সেগুলো পুরনো। নতুন করে ভিসা হওয়া প্রায় বন্ধ। করোনা যাওয়ার পর মানুষ যখন একটু সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেছিল, তখনই শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। ফলে আজ ফ্লাইট ক্যানসেল হয়তো কাল নতুন শিডিউল। মানুষ যেতে চাইলেও বর্তমানে বিমানভাড়া অনেক বেশি। আগে যেখানে ন্যূনতম ভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা, তা এখন বেড়ে হয়েছে ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার ওপরে।’আঞ্চলিক সংবাদ প্রতিবেদন